
মোঃ এহছান এলাহী
উত্তরাঞ্চলের দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতি গড়ে উঠেছে তিস্তা নদীকে ঘিরে। একসময় যে নদী ছিল জীবনের আশীর্বাদ, এখন সেটিই অভিশাপে পরিণত হয়েছে। বর্ষায় ভয়াবহ ভাঙন আর শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে বছরের পর বছর নিঃস্ব হচ্ছে তিস্তাপাড়ের মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে রাজনীতিকরা তিস্তা পুনর্খনন ও বাঁধ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিলেও ভোটের পর আর তাদের দেখা মেলে না। নদীভাঙনে হাজারো পরিবার হারিয়েছে জমি-বসতভিটা। যারা একসময় পুকুরভরা মাছ, গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরুর মালিক ছিলেন, তারা এখন দিনমজুরে পরিণত হয়েছেন।
২০১৭ সালে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় “তিস্তা বাম তীর রক্ষা গণকমিটি”র ব্যানারে তিস্তা রক্ষার আন্দোলনের সূচনা হয়। পরে “তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ”-এর মাধ্যমে এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে রংপুরের পাঁচ জেলায়— লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায়। বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলুর নেতৃত্বে “তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন” নতুন গতি পায়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ জেলার ১১টি স্থানে লক্ষ লক্ষ মানুষ তিস্তাপাড়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে “তিস্তা মহাপরিকল্পনা” বাস্তবায়নের দাবিতে। আন্দোলনের চাপে সরকারের টনক নড়ে। পরে সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের একটি প্রতিনিধি দল ঘোষণা দেয়, আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করা হবে।
তবে তিস্তাপাড়ের মানুষের দাবি, নির্বাচনের আগে অর্থাৎ চলতি নভেম্বরে কাজ শুরু না হলে তারা আবারও বৃহত্তর আন্দোলনে নামবেন। এই দাবিতে গত ১৬ অক্টোবর তিস্তার দুই তীরে ১০৫ কিলোমিটারজুড়ে মশাল প্রজ্বলন কর্মসূচি পালন করা হয়।
নদী ও চর নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে লক্ষ লক্ষ হেক্টর বালুচর জমি কৃষির আওতায় আসবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, আর উত্তরাঞ্চলে ঘটবে কৃষি বিপ্লব— যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
“তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম কমিটি”-র সাধারণ সম্পাদক সফিয়ার রহমান বলেন, “তিস্তা শুকিয়ে গেলে আমাদের জমি মরুভূমি হয়ে যায়। তিস্তা বাঁচানো মানে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ বাঁচানো।”
অন্যদিকে “তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন”-এর প্রধান সমন্বয়ক আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, “তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে উত্তরাঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হবে। সরকার নির্বাচনের আগে কাজ শুরু করতেই হবে, না হলে তিস্তাপাড়ের মানুষ বৃহত্তর আন্দোলনে নামবে।”
তিনি আরোও বলেন— “তিস্তা বাঁচলে উত্তরবঙ্গ বাঁচবে, তিস্তা বাঁচলেই বাংলাদেশ বাঁচবে।”



